ঈমান ভঙ্গের দশ কারণ | Nawaqid Al Islam | The Ten Nullifiers Of Islam

কিছু কিছু বিষয় আছে, যা একজন মুসলিমকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়, কাফিরে পরিণত করে। এ ব্যাপারে সবারই সচেতন থাকতে হবে। এখানে এরূপ ১০ টি বিষয়ে আলোচনা করা হলোঃ   

"ঈমান ভঙ্গের দশ কারণ" 

প্রথম কারণ: আল্লাহর ইবাদাতে শরিক করা। 

আল্লাহ তা'আলা বলেন,

" নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। "

📖 সূরা আন-নিসা | আয়াত ৪৮

আল্লাহ ﷻ আরও বলেন,

" নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। "

📖 সূরা আল-মায়িদাহ | আয়াত ৭২

দ্বিতীয় কারণ : আল্লাহ ও বান্দার মাঝে মাধ্যমগ্রহণ।

“কেউ যদি আল্লাহ ও তার মাঝে অন্যদের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের কাছে প্রার্থনা জানায়, শাফাআত কামনা করে এবং তাদের ওপর ভরসা করে ইজমা মতে (সর্বসম্মত মত হল) সে কাফির।'    

তৃতীয় কারণ: মুশরিকদের কাফির মনে না-করা।

“যে ব্যক্তি মুশরিকদের কাফির মনে করে না কিংবা তাদের কুফরে সন্দেহ পোষণ করে অথবা তাদের ধর্মকে সঠিক মনে করে, সে ব্যক্তি কাফির।’    

চতুর্থ কারণ: নবি ﷺ এর পথনির্দেশনার চেয়ে অন্য পথ-পদ্ধতিকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করা এবং উত্তম ভাবা।

“যে ব্যক্তি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথনির্দেশনার চেয়ে অন্য পথ-পদ্ধতিকে পরিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করে; কিংবা নবির বিধানের চেয়ে অন্য কারও বিধানকে উত্তম বলে মনে করে সে ব্যক্তি কাফির। যেমন, তাঁর আনীত বিধানের ওপর তাগূতের বিধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।” 
এগুলোর কিছু উদাহরণ : 

উদাহরণ ১ : ইসলামি শরিয়াহর পরিবর্তে মানবরচিত আইন, সংবিধান ও ব্যবস্থাকে উত্তম বলে বিশ্বাস করা। 
এর কিছু উদাহরণ হলো: 
১. এই একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামি বিধান উপযোগী নয়। 
২. ইসলামের কারণেই মুসলিমরা পিছিয়ে আছে। 
অথবা ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ ও বান্দার মাঝে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক মাত্র, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামকে টেনে আনা অযৌক্তিক। 
উদাহরণ ২ : এই কথা বলা যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তির প্রয়োগ—যেমন চোরের হাত কাটা, ব্যভিচারীকে পাথর মারা—বর্তমান যুগে অচল, মানানসই নয়। 
উদাহরণ ৩ : এই বিশ্বাস রাখা যে, লেনদেন, শাস্তি কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেসব বিধান নাযিল করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে নিজ থেকেও আইন তৈরি করা যাবে। হতে পারে আইনপ্রণেতা তার প্রণীত আইনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আইনের চেয়ে উত্তম বলে বিশ্বাস করে না, কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যা সম্পূর্ণভাবে হারাম করেছেন – যেমন যিনা, মদপান অথবা সুদ—তা হালাল বলে ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে সে প্রকৃতপক্ষে এই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আইনের চেয়ে তার প্রণীত আইনই উত্তম। মুসলিম উম্মাহ একমত, যারা এসব হারামকে হালাল বলে ঘোষণা করবে তারা কাফির। 
~ শাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল    

পঞ্চম কারণ: দ্বীনের কোনোকিছুর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করা।

‘রাসুলুল্লাহ ﷺ যা নিয়ে এসেছেন, এর কোনোকিছুর প্রতি যে-কেউ ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করে, সে যদি ওই বিধানের ওপর আমল করেও তবু সে কাফির।' 
ব্যাখ্যা : আল-ইবানাহ'য় ইমাম ইবনু বাত্তাহ কথাগুলোই এর স্বপক্ষে দলিল। তিনি বলেন, “কেউ যদি নবি-রাসুলগণের আনীত সমস্ত বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় বাদ দিয়ে বাকি সব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনে, তারপরও একটি বিষয়কে অস্বীকারের কারনে সর্বসম্মতভাবে (ইজমামতে) সে কাফির হয়ে যাবে। 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা যা নিয়ে এসেছেন, দুপ্রকারে বিভক্ত : 
১. আকায়িদ-বিশ্বাস। 
২. আমল তথা কাজে কর্মে প্রকাশের বিধান (আহকামু আমালিয়াহ)। দ্বীনের সমস্ত খুটি (আরাকান) ওয়াজিব ও সুন্নাহ এতে শামিল। 
এই দুপ্রকারের কোনোকিছুকে ঘৃণা করলে যে-কেউ কাফির হয়ে যাবে। যেমন, দাড়ি আপন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া (বড় করা), বহুবিবাহ, হিজাব, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধাপ্রদান, জিহাদ প্রভৃতি বিধানকে ঘৃণা করা। 

দ্বীনের কোনোকিছুকে ঘৃণা করার কারণে কারও ওপর কুফরের হুকুম আরোপ করতে হলে দুটো শর্ত পূর্ণ হওয়ার প্রয়োজন : 
১. এক ব্যক্তি জানে, বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহয় প্রমাণিত। তবে জানার পরও তা প্রত্যাখ্যান কিংবা ঘৃণা করলে সে কাফির হয়ে যাবে। 
২. উক্ত বিষয়টিতে ইজমা থাকতে হবে। বিষয়টি মতভেদপূর্ণ মাসআলা (মুখতালাফ ফিহি) হলে কাফির হবে না। আমরা এখানে ‘মতভেদপূর্ণ’ বলতে গ্রহণযোগ্য মতভেদ বোঝাচ্ছি।    

ষষ্ঠ কারণ: দ্বীনের কোনো বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা।

“যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত সামান্য কোনো বিষয়, আল্লাহপ্রদত্ত সাওয়াব কিংবা তাঁর কোনো শাস্তির বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে সে কাফির। আল্লাহর বাণীই এর দলিল,

“বলুন, “তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে বিদ্রুপ করছিলে? আর অজুহাত পেশ করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ। 

📖 সূরা আত-তাওবাহ | আয়াত ৬৫-৬৬

সপ্তম কারণ: জাদু করা।

‘জাদু করা। বিকর্ষণ ও আকর্ষণ করার জন্য তদবির করাও এর অন্তর্ভুক্ত। যে জাদু করবে অথবা জাদু করার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে, সে কাফির। আল্লাহর আয়াতই এর দলিল,

" অথচ এই দুই মালাক কাউকে (জাদু) শেখানোর সময় (আগেই) বলে নিত আসলে আমরা কিন্তু একটি পরীক্ষা, তাই (আমাদের শেখানো জিনিস দিয়ে) কুফরি করো না।" 

📖 সূরা আল বাকারা | ২:১০২

অষ্টম কারণ: মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাহায্য-সহযোগিতা করা।

“মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সাহায্য ও সহায়তা করা ঈমান ভঙ্গের অন্যতম কারণ। আল্লাহর আয়াতই এর দলিল,

“তোমাদের কেউ তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।" 

📖 সূরা আল মায়িদাহ | আয়াত ৫১

নবম কারণ: কাউকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়াহর ঊর্ধ্বে মনে করা।

“যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস করে কিছু কিছু মানুষের জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীয়াত থেকে বের হয়ে যাবার অনুমতি আছে, যেমনভাবে খিযিরের পক্ষে মুসা আলাইহিস সালামের শারীয়াতের বাইরে থাকার সুযোগ ছিল সে ব্যক্তি কাফির।' আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' 

📖 সুরা আলি ইমরান | আয়াত ৮৫

দশম কারণ: আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা।

"আল্লাহর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা দ্বীনের জ্ঞান অর্জনও করে না, আর সে অনুযায়ী আমলও করে না। আল্লাহর বাণীই এর দলিল,

" তার চেয়ে বড় যালিম আর কে আছে, যাকে তার রবের নিদর্শনসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পরও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়? অপরাধীদের আমি অবশ্যই শাস্তি দেবো।" 

📖 সূরা আস-সিজদাহ | আয়াত ২২

এই ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয়গুলো কৌতুকবশত বা আন্তরিকভাবে কিংবা ভীত হয়ে, যেভাবেই করা হোক না কেন, তা একজনকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয়, কাফিরে পরিণত করে। হাঁ, যদি সে প্রাণনাশের আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে করে, তবে ভিন্ন কথা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ক্রোধ ও কঠিন আযাবের কারণ এসব কাজ থেকে আমরা তাঁর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করছি।   

✒️ শাইখ আলি বিন খুদাইর আল-খুদাইর 
📖 ঈমান ভঙ্গের দশ কারণ      
Previous Post Next Post