১০ই শাবান, ১৪৪৫ | ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

আসহাবুল উখদূদের সংক্ষিপ্ত কাহিনী | The Story of Ashabul Ukhdud, The People of The Ditch

শেয়ার:

পবিত্র কুরআনের ৮৫ নং সূরা আল-বুরুজ -এ আসহাবুল উখদূদের বা ‘গর্তের মানুষের’ কথা বর্ণিত হয়েছে

অতীতকালে এক বাদশার এক জাদুকর ও গণক ছিল। যখন সে গণক বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হলো তখন সে বাদশাকে বলল, আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিন যাকে আমি এ বিদ্যা শিক্ষা দেব। সুতরাং বাদশা সে রকম একজন বুদ্ধিমান বালক খোঁজ করে তার কাছে সমর্পণ করলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক ও মুফাসসিরের মতে এই রাজার নাম ছিল ইউসুফ দু’নুয়াস ( হযরত ইবনে আববাস (রা)-এর রেওয়ায়েত মতে তার নাম ছিল ’ইউসুফ যুনাওয়াস’ )। তার সময় ছিল রসূলে করীম (ﷺ) এর জন্মের সত্তর বছর পূর্বে। সে ছিল হিমিয়ারের রাজাদের একজন। ৫২৪ সালে এই রাজার মৃত্যু হয়।

যে বালককে যাদুকরের কাছে তার বিদ্যা শিক্ষা করার জন্য বাদশাহ আদেশ করেছিল, তার নাম আবদুল্লাহ ইবনে আমের।

ঐ বালকের পথে এক পাদরিরও ঘর ছিল।পাদ্রী খৃস্টধর্মের আবেদ ও যাহেদ ছিল। তখন খৃস্টধর্ম ছিল সভ্যধর্ম, তাই এই পাদ্রী তখনকার খাঁটি মুসলমান ছিল। ’বালকটি পথিমধ্যে পাদ্রীর কাছে যেয়ে তার কথাবার্তা শুনে প্রভাবান্বিত হত এবং অবেশেষে মুসলমান হয়ে গেল। এভাবে তার আসা-যাওয়া অব্যাহত থাকে।

একদা এ বালকটির যাওয়ার পথে এক বৃহদাকার জন্তু (বাঘ অথবা সাপ) বসে ছিল যে মানুষের আসা যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল। বালকটি চিন্তা করল, আজকে আমি পরীক্ষা করব যে জাদুকর সত্য, না পাদরী। সে একটি পাথরের টুকরো কুড়িয়ে বলল, হে আল্লাহ তা‘আলা! যদি পাদরীর আমল তোমার কাছে জাদুকরের আমল থেকে উত্তম এবং পছন্দনীয় হয়, তাহলে এ জন্তুকে মেরে ফেল, যাতে মানুষ চলাচল করতে পারে। এ বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল।
এবার বালকটি পাদরীর নিকট গিয়ে সব খুলে বলল। পাদরী বললেন : হে বৎস! এবার দেখছি তুমি পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছো। এবার তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এ পরীক্ষা অবস্থায় আমার নাম তুমি প্রকাশ করবে না। এ বালকটি জন্মান্ধ ও ধবল প্রভৃতি রোগের চিকিৎসাও করত; তবে তা আল্লাহ তা‘আলার ওপর বিশ্বাসের শর্ত রেখেই করত। বালকটি এ শর্তানুযায়ী বাদশার এক সহচরের অন্ধ চক্ষুকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করে ভাল করে দেন। বালকটি বলত যে, আপনি যদি ঈমান আনেন তাহলে আমি আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করব; তিনি আরোগ্য দান করবেন। সুতরাং সে আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি রোগীকে আরোগ্য দান করতেন।
এ খবর বাদশার নিকট গেল, সে বড় উদ্বিগ্ন হলো। কিছু সংখ্যক ঈমানদারকে সে হত্যাও করে ফেললো। আর এ বালকটির ব্যাপারে তিনি কয়েকটি লোককে ডেকে বললো যে, এ বালকটিকে উঁচু পাহাড়ের ওপর নিয়ে গিয়ে নীচে ফেলে দাও। আল্লাহ্ তা’আলা তাকে পাকাপোক্ত ঈমান দান করেছিলেন। ফলে বহু নির্যাতনের মুখেও সে ঈমানে অবিচল ছিল।বালকটি আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলে পাহাড় কাপতে লাগল। সে ছাড়া সকলেই পাহাড় থেকে পড়ে গেল। বাদশা তখন বালকটিকে অপর কিছু লোকের কাছে সমর্পণ করে বললো, একে একটি নৌকায় চড়িয়ে সমুদ্রের মাঝে নিক্ষেপ কর। সেখানেও বালকটি বেঁচে গেল। এবার বালকটি বাদশাকে বলল : যদি আপনি আমাকে মারতে চান তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হলো একটি খোলা মাঠে লোকদেরকে সমবেত করে “বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম” বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষপ করুন। দেখবেন আমি মারা গেছি। বাদশা তাই করলো। ফলে বালকটি মৃত্যুবরণ করল। সে ঘটনাস্থলেই লোকেরা উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল যে, আমরা এ বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। বাদশা আরো অধিক উদ্বিগ্ন হলো। অতএব সে তাদের জন্য গর্ত খনন করে তাতে আগুন জ্বালাতে আদেশ করলো। 
অতঃপর মু’মিনদের এক একজনকে উপস্থিত করে বললঃ ঈমান পরিত্যাগ কর নতুবা এই ’গর্তে নিক্ষিপ্ত হবে। আল্লাহ্ তা’আলা মু’মিনদেরকে এমন দৃঢ়তা দান করেছিলেন যে, তাদের একজনও ঈমান ত্যাগ করতে সম্মত হল না এবং অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হওয়াকেই পছন্দ করে নিল। রাজা তখন এটিতে আগুন প্রজ্জ্বলিত করে বিশ্বাসীদেরকে তাতে নিক্ষেপ করে। রাজাটি ছিল ইহুদী ধর্মের অনুসারী, সে নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে নির্যাতন করছিল
রাজা খ্রিস্টানদেরকে বলেছিল তাদের ধর্ম ত্যাগ করতে, না হয় তাদেরকে পরিখার আগুনে ফেলে পুড়ে মারা হবে। দুষ্ট কসাই আল হাবাসার খ্রিস্টান শাসক আন নাজাশিকে উত্তেজিত করে। তিনি ইউসুফ দু’নুয়াস ও তাঁর অনুসারীদের উপর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। এই অত্যাচারী রাজা গর্তের মধ্যে আগুন প্রজ্জ্বলিত করে তার সৈনিকদেরকে নির্দেশ দেয় যাতে তারা ঈমানদার প্রত্যেক নারী পুরুষকে এই আগুনে নিক্ষেপ করে মারার ভয় প্রদর্শন করে। যারা তাদের ধর্ম ত্যাগ করতে অস্বীকার করে তাদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করতে থাকে।
সবশেষে যখন এক নারী ও তার ছোট শিশু সন্তানকে আগুনে ফেলার সময় আসলো, তখন শিশুটির মা আগুনে ঝাপ দিতে অস্বীকার করলো। তখন ঐ নারীকে লক্ষ্য করে তার ছোট্ট শিশু সন্তানটি বললো, “মা, তুমি সবর করো, তুমি অবশ্যই সত্যের পথে আছ।” (এই নারী ও তার শিশু সন্তানের বিষয়টি সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত হয়েছে।) 
এই প্রজ্বলিত আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়ে যারা প্রাণ দিয়েছিল, তাদের সংখ্যা কোন কোন রেওয়ায়েতে বার হাজার এবং কোন কোন রেওয়ায়েতে আরও বেশী বর্ণিত আছে।
রেফারেন্স
আত্‌ তাফসীর আল মুনীর: ৩০/১৫৫
সাফওয়াতুত তাফাসীর: ৩/৫৪০
আল কামুস আল ইসলামী: ১/১২০
আল মু’জাম আল মুফাহরিস লি আলফাজ আল কুরআন আল করিম: ২২৭
আল মু’জাম আল মুফাহরিস লি মাআনি আল কুরআন আল করিম: ৮০
আল মাওসুয়্যাহ আল ইসলামিয়্যাহ: ২/১০৩৫
তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন
তাফসীর ফাতহুল মাজীদ (IERF)

Deene Life Telegram Channel

Leave a Comment